বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে চায়ের দেশ সিলেট পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য ট্রেন ভ্রমণ সব সময়ই পর্যটক এবং সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়। পাহাড় আর সবুজের বুক চিরে ট্রেনের জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে যাত্রা করার মজাই আলাদা। আপনি যদি চট্টগ্রাম টু সিলেট ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়া তালিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান? তাহলে তবে এই পোস্টটি আপনার জন্য। আজকের লেখায় আমরা আলোচনা করব এই রুটে চলাচলকারী ট্রেনের বর্তমান সময়, টিকেটের দাম এবং নিরাপদ ভ্রমণের কিছু প্রয়োজনীয় টিপস।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৩৭৯ কিলোমিটার। সড়কপথের চেয়ে রেলপথের এই দীর্ঘ যাত্রা অনেক বেশি আরামদায়ক এবং ক্লান্তিহীন। সাধারণত এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে এই রুটে অত্যন্ত দক্ষভাবে যাত্রী সেবা প্রদান করছে।
চট্টগ্রাম টু সিলেট ট্রেন
চট্টগ্রাম এবং সিলেট উভয় শহরই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। একদিকে যেমন চট্টগ্রামের পাহাড় ও সমুদ্র, অন্যদিকে সিলেটের চা বাগান ও হাওড়। ব্যবসার খাতিরে বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই দুই শহরের মধ্যে যাতায়াত করেন। বাসের চেয়ে ট্রেন যাত্রা নিরাপদ ও এখানে সিটগুলো বেশ আরামদায়ক থাকে।
চট্টগ্রাম টু সিলেট আন্তঃনগর ট্রেনের সময়সূচী
চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যাতায়াতের জন্য প্রধানত দুইটি জনপ্রিয় আন্তঃনগর বা ইন্টারসিটি (Intercity) ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে। এগুলো হলো পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং উদয়ন এক্সপ্রেস। নিচে এগুলোর বিস্তারিত সময়সূচী দেওয়া হলো:
১. পাহাড়িকা এক্সপ্রেস (৭১৯)
পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এই রুটের অন্যতম পুরনো এবং বিশ্বস্ত একটি ট্রেন। এটি দিনের বেলা চলাচল করে, ফলে যাত্রীরা পাহাড় এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
- ছাড়ার সময়: সকাল ০৯:০০ মিনিট (চট্টগ্রাম স্টেশন)।
- পৌঁছানোর সময়: সন্ধ্যা ০৬:০০ মিনিট (সিলেট স্টেশন)।
- বন্ধের দিন: সোমবার।
২. উদয়ন এক্সপ্রেস (৭২৩)
যারা রাতের ভ্রমণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তাদের জন্য উদয়ন এক্সপ্রেস সেরা পছন্দ। রাতে ট্রেন থেকে বাইরের মনোরম পরিবেশ আর শান্ত প্রকৃতি উপভোগ করে সকালে সিলেটে পৌঁছানো যায়।
- ছাড়ার সময়: রাত ০৯:৪৫ মিনিট (চট্টগ্রাম স্টেশন)।
- পৌঁছানোর সময়: ভোর ০৬:০০ মিনিট (সিলেট স্টেশন)।
- বন্ধের দিন: শনিবার।
চট্টগ্রাম টু সিলেট মেইল এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী
আন্তঃনগর ট্রেন ছাড়াও এই রুটে কম খরচে যাতায়াতের জন্য মেইল ট্রেন সুবিধা রয়েছে। তবে এই ট্রেনগুলোতে সময় একটু বেশি লাগে।
জালালাবাদ এক্সপ্রেস (১৩)
জালালাবাদ এক্সপ্রেস মূলত মেইল এক্সপ্রেস ট্রেন। জালালাবাদ এক্সপ্রেস সব স্টেশনে থামে বলে এর গতি কিছুটা কম।
- ছাড়ার সময়: সন্ধ্যা ০৭:৩০ মিনিট।
- পৌঁছানোর সময়: পরদিন সকাল ১১:০০ মিনিট।
- বন্ধের দিন: এই ট্রেনের কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই।
চট্টগ্রাম টু সিলেট ট্রেনের ভাড়া তালিকা ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভিন্ন শ্রেণির আসনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া নির্ধারণ করেছে। আপনার বাজেট এবং আরামের কথা মাথায় রেখে নিচের তালিকা থেকে আপনার পছন্দের আসন বেছে নিতে পারেন।
ভাড়া ও আসনঃ
| আসন বিভাগ | টিকেটের মূল্য (ভ্যাটসহ আনুমানিক) |
| শোভন | ৩১৫ টাকা |
| শোভন চেয়ার | ৩৭৫ টাকা |
| প্রথম আসন | ৫০০ টাকা |
| প্রথম বার্থ | ৭৪৫ টাকা |
| স্নিগ্ধা (এসি সিট) | ৭১৯ টাকা |
| এসি সিট (বিথ) | ৮৫৭ টাকা |
| এসি বার্থ | ১২৮৮ টাকা |
দ্রষ্টব্য: রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় ভাড়ার পরিবর্তন করতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা টিকেট কাউন্টার থেকে বর্তমান ভাড়া যাচাই করে নেওয়া ভালো।
ট্রেনের টিকেট কাটবেন যেভাবে
বর্তমানে রেলওয়ের টিকেট কাটা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। আপনি দুইভাবে টিকেট সংগ্রহ করতে পারেন:
১. রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টার থেকে: সরাসরি চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে লাইন দাঁড়িয়ে টিকেট সংগ্রহ করতে পারেন। যাত্রার অন্তত ২-৩ দিন আগে টিকেট কাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
২. অনলাইন বা অ্যাপের মাধ্যমে: বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (eticket.railway.gov.bd) বা ‘Rail Sheba’ অ্যাপ ব্যবহার করে ঘরে বসেই টিকেট বুক করা যায়। বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্ট করে আপনি আপনার ই-টিকেট ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
ট্রেন ভ্রমণের সময় প্রয়োজনীয় টিপস
চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে যাওয়ার পথে কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে আপনার ভ্রমণ হবে আরও আনন্দদায়ক:
- দীর্ঘ যাত্রা হওয়ায় সাথে শুকনো খাবার এবং পানির বোতল রাখুন। যদিও ট্রেনে খাবারের ব্যবস্থা থাকে, তবে নিজের সাথে কিছু রাখা নিরাপদ।
- আপনার মালামাল সাবধানে রাখুন। বিশেষ করে মোবাইল বা ল্যাপটপ চার্জ দেওয়ার সময় খেয়াল রাখুন।
- ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
- ট্রেনের ভেতর ময়লা-আবর্জনা না ফেলে ডাস্টবিন ব্যবহার করুন। দেশের সম্পদ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
চট্টগ্রাম টু সিলেট ট্রেনের স্টপেজ সমূহ
এই রুটের আন্তঃনগর ট্রেনগুলো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রা বিরতি দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ফেনী জংশন
- নাঙ্গলকোট
- লাকসাম জংশন
- কুমিল্লা
- আখাউড়া জংশন
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া
- শায়েস্তাগঞ্জ
- শ্রীমঙ্গল
- কুলাউড়া
আপনি যদি মাঝপথের কোনো স্টেশনের যাত্রী হয়ে থাকেন, তবে আপনার স্টেশনে ট্রেন কখন পৌঁছাবে তা ট্রেনের লোকেশন অ্যাপ থেকে দেখে নিতে পারেন।
আরও জেনে রাখুনঃ চট্টগ্রাম টু ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রেনের সময়সূচী
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের ট্রেনের দূরত্ব কত?
চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের রেল দূরত্ব প্রায় ৩৭৯ কিলোমিটার।
পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি কখন ছাড়ে?
পাহাড়িকা এক্সপ্রেস প্রতিদিন সকাল ০৯:০০ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।
উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের বন্ধের দিন কবে?
উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন হলো শনিবার।
ট্রেনের এসি সিটের ভাড়া কত?
চট্টগ্রাম থেকে সিলেট রুটে স্নিগ্ধা বা এসি সিটের ভাড়া আনুমানিক ৭১৯ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া ১২৮৮ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
জালালাবাদ এক্সপ্রেস কি প্রতিদিন চলে?
হ্যাঁ, জালালাবাদ এক্সপ্রেস মেইল ট্রেনটি সপ্তাহের প্রতিদিন চলাচল করে।
শেষ কথা
চট্টগ্রাম টু সিলেট ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়া তালিকা সঠিক জানা থাকলে আপনার পরিকল্পনা আরও গোছানো হবে। পাহাড়িকা বা উদয়ন এক্সপ্রেস যে ট্রেনেই যান না কেন? রেলওয়ের এই দীর্ঘ যাত্রা আপনার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। পরিবারের সাথে আনন্দময় ও নিরাপদ ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে হতে পারে আপনার প্রথম পছন্দ।






