বাংলাদেশের পর্যটন নগরী হিসেবে সিলেটের খ্যাতি জগতজুড়ে। চা বাগান, পাহাড় আর ঝর্ণার টানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকা থেকে সিলেটে ভ্রমণ করেন। কেউ যান ব্যবসায়িক কাজে, আবার কেউ যান পরিবার নিয়ে ঘুরতে। যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বাস বা বিমান থাকলেও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অধিকাংশ মানুষের প্রথম পছন্দ হলো ট্রেন। আপনিও কি নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য ঢাকা টু সিলেট ট্রেনের সময়সূচী এবং ভাড়ার তালিকা খুঁজছেন? তাহলে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ঢাকা থেকে সিলেট রুটে চলাচলকারী সকল আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনের সময়সূচী, ছুটির দিন ও টিকিটের মূল্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এছাড়াও টিকেট কাটার নিয়ম ও যাত্রাপথের প্রয়োজনীয় কিছু টিপস থাকছে আপনার জন্য। চলুন ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়ার আগে সকল তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
ঢাকা টু সিলেট রেলওয়ে রুট পরিচিতি
ঢাকা থেকে সিলেটের রেলপথে দূরত্ব প্রায় ২৩৫ কিলোমিটার। এই রুটটি বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর রেলপথ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল এবং লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে যখন ট্রেন চলে, তখন দুপাশের দৃশ্য যাত্রীদের মুগ্ধ করে। এই রুটে বাংলাদেশ রেলওয়ে বেশ কয়েকটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ট্রেন পরিচালনা করে। সঠিক সময়সূচী জানা থাকলে আপনি আপনার পছন্দমতো সময়ে যাত্রা শুরু করতে পারবেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা এড়াতে পারবেন।
ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে নিয়মিত ৪টি আন্তঃনগর ট্রেন এবং ১টি মেইল ট্রেন ছেড়ে যায়। প্রতিটি ট্রেনের সময় এবং সুযোগ-সুবিধা ভিন্ন। নিচে আমরা প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে আলোচনা করব।
ঢাকা টু সিলেট ট্রেনের সময়সূচী (আন্তঃনগর)
যারা দ্রুত এবং আরামদায়কভাবে গন্তব্যে পৌঁছাতে চান, তাদের জন্য আন্তঃনগর ট্রেনই সেরা মাধ্যম। ঢাকা টু সিলেট রুটে বর্তমানে ৪টি জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। এগুলো হলোঃ পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস এবং কালনী এক্সপ্রেস। প্রতিটি ট্রেনেরই সপ্তাহে একটি করে ছুটির দিন থাকে সেদিন ট্রেনটি চলাচল করে না। তাই টিকেট কাটার আগে অবশ্যই ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটির দিন সম্পর্কে জেনে নেওয়া জরুরি।
নিচে ছকের মাধ্যমে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর সময়সূচী তুলে ধরা হলো:
| ট্রেনের নাম | ট্রেন নং | সাপ্তাহিক ছুটি | ছাড়ার সময় (ঢাকা) | পৌঁছানোর সময় (সিলেট) |
| পারাবত এক্সপ্রেস | ৭০৯ | মঙ্গলবার | সকাল ০৬:২০ মি. | দুপুর ০১:০০ মি. |
| জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস | ৭১৭ | নেই | সকাল ১১:১৫ মি. | সন্ধ্যা ০৭:০০ মি. |
| কালনী এক্সপ্রেস | ৭৭৩ | শুক্রবার | বিকাল ০৩:০০ মি. | রাত ০৯:৩০ মি. |
| উপবন এক্সপ্রেস | ৭৩৯ | বুধবার | রাত ০৮:৩০ মি. | ভোর ০৫:০০ মি. |
আন্তঃনগর ট্রেন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য
ট্রেনের সময়সূচী তো জানলেন, এবার চলুন এই ট্রেনগুলো সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত জেনে নেই, যা আপনাকে সঠিক ট্রেনটি বেছে নিতে সাহায্য করবে।
পারাবত এক্সপ্রেস (৭০৯)
যারা খুব সকালে যাত্রা শুরু করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য পারাবত এক্সপ্রেস সেরা অপশন। এটি ভোর ৬টা ২০ মিনিটে ঢাকা ছেড়ে যায় এবং দুপুরের খাবারের আগেই আপনাকে সিলেটে পৌঁছে দেবে। এই ট্রেনটি বেশ দ্রুতগামী এবং এতে আধুনিক বগি সংযুক্ত রয়েছে। তবে মনে রাখবেন, মঙ্গলবার এই ট্রেনটি বন্ধ থাকে।
জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস (৭১৭)
আপনি যদি সকালের ঘুম নষ্ট না করে ধীরে-সুস্থে যাত্রা করতে চান, তবে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস বেছে নিতে পারেন। এটি বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে ছাড়ে। এই ট্রেনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই, অর্থাৎ সপ্তাহের ৭ দিনই এটি চলাচল করে। দিনের আলোতে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে এই ট্রেনটি ভালো।
কালনী এক্সপ্রেস (৭৭৩)
অফিস বা জরুরি কাজ শেষ করে বিকেলে রওনা দিতে চাইলে কালনী এক্সপ্রেস উপযুক্ত। এটি বিকাল ৩টায় ঢাকা ছাড়ে এবং রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে সিলেট পৌঁছে যায়। এটি এই রুটের অন্যতম জনপ্রিয় একটি ট্রেন। শুক্রবার বাদে সপ্তাহের বাকি ৬ দিন এটি নিয়মিত চলাচল করে।
উপবন এক্সপ্রেস (৭৩৯)
যারা রাতে ভ্রমণ করে সময় বাঁচাতে চান, তাদের জন্য উপবন এক্সপ্রেস আদর্শ। রাত ৮টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে এটি ভোরে সিলেটে পৌঁছায়। ফলে আপনি সারারাত ট্রেনে ঘুমিয়ে সকালে সতেজ হয়ে সিলেটে নামতে পারবেন। বুধবার এই ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি।
ঢাকা টু সিলেট ট্রেনের সময়সূচী (মেইল এক্সপ্রেস)
আন্তঃনগর ট্রেনের পাশাপাশি এই রুটে মেইল বা লোকাল ট্রেনও চলাচল করে। যারা কম খরচে যাতায়াত করতে চান অথবা আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট পাননি তারা মেইল ট্রেন ব্যবহার করতে পারেন। তবে মেইল ট্রেনে সময় কিছুটা বেশি লাগে কারণ এটি প্রায় সব স্টেশনে থামে। ঢাকা থেকে সুরমা এক্সপ্রেস নামে একটি মেইল ট্রেন এই রুটে চলে।
| ট্রেনের নাম | ট্রেন নং | সাপ্তাহিক ছুটি | ছাড়ার সময় (ঢাকা) | পৌঁছানোর সময় (সিলেট) |
| সুরমা এক্সপ্রেস | ০৯ | নেই | রাত ১০:৫০ মি. | দুপুর ১২:১০ মি. |
সুরমা এক্সপ্রেস (০৯)
এই ট্রেনটি রাত ১০টা ৫০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশন ত্যাগ করে এবং পরদিন দুপুরে সিলেটে পৌঁছায়। এটির কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই। বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য এটি একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
ঢাকা টু সিলেট ট্রেনের ভাড়া তালিকা
ভ্রমণের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ট্রেনের টিকিটের মূল্য নির্ভর করে আপনি কোন ধরণের আসনে ভ্রমণ করবেন তার ওপর। বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে বিভিন্ন ক্যাটাগরির আসন ব্যবস্থা রেখেছে। এর মধ্যে শোভন চেয়ার থেকে শুরু করে এসি বার্থ পর্যন্ত রয়েছে।
ঢাকা টু সিলেট রুটের ভ্যাটসহ ট্রেনের টিকিটের হালনাগাদ মূল্য তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| আসনের ধরণ (শ্রেণী) | টিকিটের মূল্য (টাকা) |
| শোভন চেয়ার | ৩৭৫ টাকা |
| প্রথম আসন (First Seat) | ৫৭৫ টাকা |
| স্নিগ্ধা (AC Chair) | ৭১৯ টাকা |
| এসি সিট (AC Seat) | ৮৬৩ টাকা |
| এসি বার্থ (AC Berth) | ১২৮৮ টাকা |
কোন আসনের সুবিধা কেমন?
- শোভন চেয়ার: সাধারণ যাত্রীদের জন্য এটি সবচেয়ে সাশ্রয়ী। এতে ফ্যান থাকে এবং সিটগুলো মোটামুটি আরামদায়ক। যারা কম খরচে ভ্রমণ করতে চান তাদের জন্য এটি সেরা।
- স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার): এটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ। বাইরের শব্দ ও ধুলোবালি থেকে মুক্ত হয়ে আরামে ভ্রমণ করতে চাইলে স্নিগ্ধা বেছে নিতে পারেন। এর সিটগুলো বেশ প্রশস্ত এবং আরামদায়ক।
- এসি বার্থ: এটি ট্রেনের সবচেয়ে প্রিমিয়াম সেবা। এখানে শোবার ব্যবস্থা থাকে। বিশেষ করে রাতের জার্নি বা উপবন এক্সপ্রেসের জন্য এসি বার্থ খুবই আরামদায়ক। এর কেবিনে প্রাইভেসি রক্ষা করা সহজ।
টিকেট কাটার নিয়ম ও পরামর্শ
ট্রেনের টিকেট কাটার বিষয়টি এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। আপনি দুইভাবে টিকেট সংগ্রহ করতে পারেন:
- ১. অনলাইনে: বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা ‘Rail Sheba’ অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই টিকেট কাটতে পারেন। এর জন্য আপনার এনআইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা থাকতে হবে।
- ২. কাউন্টারে: সরাসরি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টারে গিয়েও টিকেট কাটা যায়। তবে ঈদের সময় বা ছুটির দিনে কাউন্টারে প্রচুর ভিড় থাকে।
টিকেট কাটার সময় কিছু বিষয় মনে রাখবেন:
- ভ্রমণের অন্তত কয়েকদিন আগে টিকেট কাটার চেষ্টা করবেন, কারণ এই রুটে টিকেটের চাহিদা অনেক বেশি থাকে।
- অনলাইনে টিকেট কাটলে পেমেন্ট নিশ্চিত করার পর টিকেটটি ডাউনলোড বা প্রিন্ট করে রাখবেন।
- ভ্রমনের সময় অবশ্যই নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র বা তার কপি সাথে রাখবেন, টিটিই চেক করতে চাইলে দেখাতে হবে।
ঢাকা টু সিলেট ট্রেন ভ্রমণের টিপস
একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভ্রমণের জন্য কিছু প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। আপনার যাত্রা যেন নির্বিঘ্ন হয়, সেজন্য নিচে কিছু টিপস দেওয়া হলো:
- সময়ের আগে স্টেশনে পৌঁছান: ঢাকা শহরে ট্রাফিক জ্যামের কথা মাথায় রেখে ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট আগে কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন।
- খাবার ও পানি: যদিও ট্রেনের ভেতরে খাবার গাড়ি বা প্যান্ট্রি কার থাকে, তবুও সাথে শুকনা খাবার এবং পানি রাখা ভালো। ট্রেনের খাবারের মান সবসময় সন্তোষজনক নাও হতে পারে।
- মালামাল সাবধানে রাখুন: নিজের লাগেজ বা ব্যাগ সবসময় নজরে রাখবেন। রাতে ঘুমানোর সময় সতর্ক থাকবেন।
- জানালা দিয়ে দৃশ্য উপভোগ: দিনের বেলার ট্রেনগুলোতে (পারাবত বা জয়ন্তিকা) জানলার পাশের সিট নেওয়ার চেষ্টা করবেন। শ্রীমঙ্গল পার হওয়ার সময় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যখন ট্রেন যায়, সেই দৃশ্য আপনার মন ভালো করে দেবে।
- শীতকালীন সতর্কতা: আপনি যদি শীতকালে ভ্রমণ করেন এবং এসি কোচে যান, তবে অবশ্যই সাথে হালকা গরম কাপড় রাখবেন। ট্রেনের এসি অনেক সময় বেশ ঠান্ডা থাকে।
শেষ কথা
ঢাকা থেকে সিলেট ভ্রমণ মানেই এক আনন্দের অভিজ্ঞতা। আর সেই অভিজ্ঞতাকে আরও রঙিন করে তোলে ট্রেন ভ্রমণ। বাসের যানজট আর ঝাঁকুনি এড়িয়ে ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দে চা বাগানের দেশ সিলেটে যাওয়ার মজাই আলাদা। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা চেষ্টা করেছি ঢাকা টু সিলেট ট্রেনের সময়সূচী, ছুটির দিন এবং ভাড়ার তালিকা সম্পর্কে আপনাকে ১০০% সঠিক ও নির্ভুল তথ্য দেওয়ার। আশা করি এই তথ্যগুলো আপনার পরবর্তী সিলেট ভ্রমণে সহায়ক হবে। টিকিট কাটার আগে সময়সূচী এবং ভাড়ার তালিকাটি আরেকবার মিলিয়ে নিতে পারেন। আপনার যাত্রা শুভ ও নিরাপদ হোক।
FAQs
ঢাকা টু সিলেট ট্রেনের ভাড়া কত?
ঢাকা থেকে সিলেট ট্রেনের ভাড়া শোভন চেয়ার ৩৭৫ টাকা, স্নিগ্ধা ৭১৯ টাকা এবং এসি বার্থ ১২৮৮ টাকা। তবে ট্রেনের ধরণ ও আসনভেদে ভাড়ার এই তারতম্য হয়ে থাকে।
ঢাকা থেকে সিলেট যেতে কত সময় লাগে?
ট্রেন ও যাত্রাপথের বিরতির ওপর নির্ভর করে ঢাকা থেকে সিলেট যেতে সাধারণত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। মেইল ট্রেনে সময় আরও বেশি লাগতে পারে।
ঢাকা টু সিলেট রুটে সবচেয়ে ভালো ট্রেন কোনটি?
সার্ভিস এবং সময়ের দিক থেকে পারাবত এক্সপ্রেস এবং কালনী এক্সপ্রেস যাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তবে রাতে ভ্রমণের জন্য উপবন এক্সপ্রেস ভালো।
কালনী এক্সপ্রেস কি শুক্রবার চলে?
না, কালনী এক্সপ্রেসের সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার। এদিন ট্রেনটি চলাচল করে না।
অনলাইনে ট্রেনের টিকেট কিভাবে কাটব?
বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (eticket.railway.gov.bd) বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে খুব সহজেই অনলাইনে টিকেট কাটতে পারবেন।
উপবন এক্সপ্রেস কয়টায় ছাড়ে?
উপবন এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে রাত ০৮:৩০ মিনিটে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।






