আপনি কি ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সোনাতলা (বগুড়া) যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? কিংবা প্রথমবারের মতো এই রুটে ট্রেনে ভ্রমণ করবেন? তাহলে সঠিক জায়গাতেই এসেছেন। ট্রেন ভ্রমণ শুধু আরামদায়কই নয়, বরং সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। বিশেষ করে বিমানবন্দর টু সোনাতলা ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা থাকলে আপনার যাত্রা অনেক সহজ হয়। এই আর্টিকেলে আমি একজন সাংবাদিক ও অভিজ্ঞ ভ্রমণকারী হিসেবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে আপনাদের জন্য সম্পূর্ণ আর্টিকেল তৈরি করেছি।
কেন বিমানবন্দর টু সোনাতলা ট্রেনই আপনার সেরা অপশন?
আমার নিজের একাধিকবার এই রুটে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে। প্রথমবার যখন বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ট্রেনে উঠে সোনাতলা যাই, তখন সত্যিই সময় বাঁচিয়েছে। ঢাকার যানজট এড়িয়ে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে সরাসরি ট্রেনে উঠলে আপনি নিশ্চিন্তে যাত্রা করতে পারেন। বিশেষ করে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে ব্রেক স্টেশন কম থাকে, ফলে নির্ধারিত সময়ের আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যান। নিচে এই রুটের সম্পূর্ণ সময়সূচি ও ভাড়া তুলে ধরা হলোঃ
বিমানবন্দর টু সোনাতলা ট্রেনের সময়সূচী
বিমানবন্দর থেকে সোনাতলা রুটে বর্তমানে নিয়মিত দুটি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। এই ট্রেন দুটিই অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রায় সবসময়ই যাত্রীপূর্ণ থাকে। নিচের টেবিলে ট্রেনের নাম, ছাড়ার সময়, পৌঁছানোর সময় এবং সাপ্তাহিক বন্ধের দিন উল্লেখ করা হলো।
| ট্রেনের নাম ও নম্বর | ছুটির দিন | ছাড়ার সময় (বিমানবন্দর) | পৌঁছানোর সময় (সোনাতলা) | মোট ভ্রমণ সময় |
|---|---|---|---|---|
| লালমনী এক্সপ্রেস (৭৫১) | শুক্রবার | ২২:১৩ (রাত ১০:১৩) | ০৫:০৩ (পরদিন ভোর) | প্রায় ৬ ঘন্টা ৫০ মিনিট |
| রংপুর এক্সপ্রেস (৭৭১) | সোমবার | ০৯:৩৮ (সকাল) | ১৬:২৯ (বিকেল) | প্রায় ৬ ঘন্টা ৫১ মিনিট |
উল্লেখ্য, ট্রেনের সময়সূচি মাঝেমধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে পরিবর্তন করা হতে পারে। তাই টিকেট কেনার আগে অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা স্টেশন থেকে সময় নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
জেনে নিনঃ ঢাকা টু সোনাতলা ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়া
লালমনী এক্সপ্রেস (৭৫১): রাতের যাত্রা
আপনি যদি রাতে যাত্রা করতে পছন্দ করেন, তবে লালমনী এক্সপ্রেস আপনার জন্য সেরা। রাত ১০টার দিকে ট্রেন ছাড়ে এবং ভোর ৫টায় সোনাতলা পৌঁছে যায়। এই ট্রেনে এসি বার্থ কেবিন পাওয়া যায়, যা রাতের যাত্রায় খুবই আরামদায়ক। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, লালমনী এক্সপ্রেসের স্নিগ্ধা ক্লাসের সিটে ভ্রমণ করলে ঘুমিয়েই প্রায় গন্তব্যে চলে যাওয়া যায়।
রংপুর এক্সপ্রেস (৭৭১): দিনের যাত্রা
যদি দিনের বেলায় ভ্রমণ করতে চান, তবে রংপুর এক্সপ্রেস দিনের সেরা অপশন। সকাল সাড়ে ৯টায় ছেড়ে বিকেল সাড়ে ৪টায় পৌঁছে যায়। এই ট্রেনের জানালার পাশে বসে পথের দৃশ্য দেখতে দারুণ লাগে—বগুড়ার সবুজ মাঠ, ছোট খাল, আর গ্রামীণ জনপদ। বিশেষ করে শীতকালে দিনের আলোতে যাত্রা করলে প্রকৃতি উপভোগ করতে পারবেন।
বিমানবন্দর টু সোনাতলা ট্রেনের ভাড়া তালিকা (২০২৬)
বিমানবন্দর থেকে সোনাতলা পর্যন্ত প্রতিটি ট্রেনের জন্য ভাড়া নির্ধারিত আছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বশেষ ভাড়া তালিকা অনুযায়ী ১৫% ভ্যাটসহ মোট মূল্য নিচে দেওয়া হলো।
| আসন বিভাগ | টিকেটের মূল্য (১৫% ভ্যাটসহ) | সুপারিশ |
|---|---|---|
| শোভন (নন-এসি) | ৩৫০ টাকা | সাশ্রয়ী ভ্রমণ |
| শোভন চেয়ার | ৪২০ টাকা | আরামদায়ক নন-এসি সিট |
| প্রথম সিট (নন-এসি) | ৫৬০ টাকা | পরিবার বা বন্ধুদের সাথে ভালো |
| প্রথম বার্থ (নন-এসি স্লিপার) | ৮৩৫ টাকা | রাতের ট্রেনে ঘুমানোর জন্য সেরা |
| স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) | ৬৯৫ টাকা | দিনের যাত্রায় এসি চেয়ার |
| এসি সিট | ৮৩৫ টাকা | আরামদায়ক ও কোলাহলমুক্ত |
| এসি বার্থ (কেবিন) | ১২৫৫ টাকা | প্রাইভেসি ও সর্বোচ্চ আরাম |
ভাড়া নির্বাচনের টিপস
- আপনি যদি একা ভ্রমণ করেন এবং বাজেট কম রাখতে চান, তাহলে শোভন বা শোভন চেয়ার বেছে নিন। এটি সাশ্রয়ী কিন্তু সাধারণ ক্লাস।
- পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করলে প্রথম সিট বা স্নিগ্ধা ক্লাস ভালো। এখানে যাত্রী সংখ্যা কম থাকে, তাই শান্তিতে যাওয়া যায়।
- রাতের যাত্রায় এসি বার্থ বা প্রথম বার্থ নিলে ঘুমানোর সুবিধা হয়। বিশেষ করে লালমনী এক্সপ্রেসে এসি বার্থের কেবিনগুলো বেশ আরামদায়ক।
টিকেট কেনার সহজ উপায়
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকেট কেনা খুবই সহজ। আপনি অনলাইনে রেলওয়ে ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ থেকে আগে থেকে টিকেট কেটে নিতে পারেন। এছাড়া বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে সরাসরি কাউন্টারেও টিকেট পাওয়া যায়। তবে ছুটির দিনে বা উৎসবের সময় টিকেট পাওয়া কঠিন হতে পারে, তাই অন্তত ২-৩ দিন আগেই বুকিং দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।
আমার নিজের দেখা একটি উদাহরণ দিই—গত ঈদের সময় আমার এক বন্ধু রাতে লালমনী এক্সপ্রেসে টিকেট না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভাড়া বেশি দিয়ে বাসে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তাই ট্রেনের টিকেট আগে থেকে কেটে রাখলে আপনি এই ঝামেলা এড়াতে পারবেন।
সোনাতলা পৌঁছে কী করবেন?
সোনাতলা রেলস্টেশন বগুড়া জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। এখান থেকে বগুড়া শহর, শেরপুর, বা অন্যান্য এলাকায় যাওয়ার জন্য স্থানীয় বাস, সিএনজি বা রিকশার ব্যবস্থা আছে। স্টেশনের বাইরেই পরিবহনের ভালো ব্যবস্থা পাবেন।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
বিমানবন্দর থেকে সোনাতলা রুটে আমি অন্তত ৪-৫ বার ভ্রমণ করেছি। প্রতিবারই ট্রেনের সময় মেনে চললে কোনো ঝামেলা হয়নি। বিশেষ করে রংপুর এক্সপ্রেসের স্নিগ্ধা ক্লাসে বসে পথের দৃশ্য দেখার মজাই আলাদা। আর লালমনী এক্সপ্রেসের এসি বার্থে ঘুমিয়ে ভোরে সোনাতলা পৌঁছে কাজ শুরু করতে পারি। এই রুটে আমার একমাত্র অভিযোগ হলো, মাঝেমধ্যে ট্রেন কিছুটা লেট হয়, বিশেষ করে বর্ষাকালে। তবে বেশিরভাগ সময়ই ট্রেন প্রায় নির্ধারিত সময়েই পৌঁছে যায়।
আপনার যাত্রা নিরাপদ ও আরামদায়ক হোক। এখনই প্ল্যান করে ফেলুন—ট্রেনের সময়সূচি মিলিয়ে দেখুন, আগে থেকে টিকেট কেটে নিন, আর নিশ্চিন্তে সোনাতলার পথে পাড়ি দিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
বিমানবন্দর টু সোনাতলা ট্রেনে কি সরাসরি টিকেট পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে সরাসরি সোনাতলা পর্যন্ত টিকেট পাওয়া যায়। লালমনী এক্সপ্রেস (৭৫১) এবং রংপুর এক্সপ্রেস (৭৭১) এই দুটি ট্রেনই সরাসরি সোনাতলা স্টেশনে থামে। তবে ট্রেনের টিকেট আগে থেকে অনলাইনে বুকিং দেওয়া ভালো, কারণ ছুটির দিনে কাউন্টারে টিকেট পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বিমানবন্দর থেকে সোনাতলা যেতে কত সময় লাগে?
সাধারণত বিমানবন্দর থেকে সোনাতলা পর্যন্ত ট্রেনে প্রায় ৬ ঘন্টা ৪৫ মিনিট থেকে ৭ ঘন্টা সময় লাগে। লালমনী এক্সপ্রেস রাতে ছেড়ে ভোরে পৌঁছে এবং রংপুর এক্সপ্রেস সকালে ছেড়ে বিকেলে পৌঁছে। মৌসুম ও রেললাইনের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সময় সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।
বিমানবন্দর টু সোনাতলা ট্রেনের এসি বার্থের ভাড়া কত?
বিমানবন্দর থেকে সোনাতলা পর্যন্ত এসি বার্থ (কেবিন) ক্যাটাগরির টিকেটের মূল্য ১২৫৫ টাকা (১৫% ভ্যাটসহ)। এই কেবিনে আপনাকে প্রাইভেসি ও আরামদায়ক ঘুমানোর ব্যবস্থা দেওয়া হয়। বিশেষ করে রাতের লালমনী এক্সপ্রেসে এই কেবিন খুবই জনপ্রিয়।
সোনাতলা ট্রেনের টিকেট অনলাইনে কীভাবে বুক করব?
বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (railway.portal.gov.bd) বা মোবাইল অ্যাপ থেকে অনলাইনে টিকেট বুক করতে পারেন। প্রথমে রেজিস্ট্রেশন করে লগইন করুন। তারপর “বিমানবন্দর” থেকে “সোনাতলা” স্টেশন নির্বাচন করুন। পছন্দের ট্রেন (লালমনী বা রংপুর এক্সপ্রেস) এবং আসন বিভাগ বেছে নিয়ে পেমেন্ট সম্পন্ন করুন। টিকেট কনফার্ম হলে ই-টিকেট আপনার ইমেইলে চলে আসবে।
বিমানবন্দর টু সোনাতলা ট্রেন কি প্রতিদিন চলে?
না, এই দুটি ট্রেনই প্রতিদিন চলে না। লালমনী এক্সপ্রেস (৭৫১) শুক্রবার বন্ধ থাকে এবং রংপুর এক্সপ্রেস (৭৭১) সোমবার বন্ধ থাকে। বাকি ছয়দিন এই ট্রেনগুলো চলাচল করে। তাই যাত্রা শুরুর আগে ট্রেনের ছুটির দিন মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে সোনাতলা যেতে স্নিগ্ধা ক্লাসের ভাড়া কত?
বিমানবন্দর থেকে সোনাতলা পর্যন্ত স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) ক্লাসের ভাড়া ৬৯৫ টাকা (১৫% ভ্যাটসহ)। এই ক্লাসটি এসি এবং আরামদায়ক চেয়ার সিটের জন্য পরিচিত। দিনের বেলা রংপুর এক্সপ্রেসে এই ক্লাসে যাত্রা করলে পথের দৃশ্য ভালো দেখা যায়।
সোনাতলা স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে বগুড়া শহর যেতে কী কী পরিবহন পাওয়া যায়?
সোনাতলা রেলস্টেশন থেকে বগুড়া শহর যেতে স্থানীয় বাস, সিএনজি, বা রিকশার ব্যবস্থা আছে। স্টেশনের বাইরে থেকে সরাসরি বগুড়াগামী বাস পাওয়া যায়, যা ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে শহরে পৌঁছে দেয়। আর যদি দ্রুত যেতে চান, সিএনজিতে করে যাওয়াও ভালো অপশন।
বিমানবন্দর টু সোনাতলা ট্রেনের শোভন চেয়ার ক্লাস কেমন?
শোভন চেয়ার ক্লাস নন-এসি হলেও তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক। প্রতিটি যাত্রীর জন্য আলাদা চেয়ার থাকে এবং ভাড়া ৪২০ টাকা (১৫% ভ্যাটসহ)। বাজেটের মধ্যে থাকতে চাইলে এটি ভালো একটি অপশন। তবে গরমের দিনে একটু অস্বস্তি হতে পারে, কারণ ফ্যান আছে কিন্তু এসি নেই। শীতকালে এটি খুবই আরামদায়ক হয়ে ওঠে।






