বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মধ্যে যাতায়াত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই রুটে যাত্রীদের আরামদায়ক ও দ্রুততম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে বেশ কিছু বিলাসবহুল ট্রেন চালু করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সোনার বাংলা এক্সপ্রেস। আপনি যদি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন। তাহলে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী, টিকেট মূল্য এবং সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা এই ভিআইপি ট্রেনটির সকল খুঁটিনাটি তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরব।
সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেন পরিচিতি (৭৮৭/৭৮৮)
সোনার বাংলা এক্সপ্রেস (ট্রেন নং ৭৮৭ / ৭৮৮) বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে পরিচালিত একটি বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন। ২০১৬ সালে এই ট্রেনটি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রা শুরু করে। সুবর্ণ এক্সপ্রেসের পর এটিই এই রুটের দ্বিতীয় বিরতিহীন ট্রেন।
এই ট্রেনটি মূলত তাদের জন্য যারা কম সময়ে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন। ট্রেনটিতে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনে সাধারণত এসি স্লিপিং চেয়ার, এসি চেয়ার এবং শোভন চেয়ারের ব্যবস্থা থাকে। এর সাথে যুক্ত আছে আধুনিক মানসম্মত খাবার গাড়ি বা ডাইনিং কার। নামাজের জন্য আলাদা স্থান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম ও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই ট্রেনটিকে অন্য সব ট্রেন থেকে আলাদা করেছে।
সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬
যেকোনো ভ্রমণের আগে সেই পরিবহনের সঠিক সময় জানাটা খুব জরুরি। সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে যাত্রীরা দিনের কাজ শেষ করে বা দিনের শুরুতেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। এই ট্রেনটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা উভয় পথেই চলাচল করে।
এটি ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সকাল ৭:০০ মিনিটে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে বিকেল ৪:৪৫ মিনিটে (১৬:৪৫) ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
ঢাকা টু চট্টগ্রাম সময়সূচী:
| ট্রেনের নাম | ট্রেন নং | ছাড়ার স্টেশন | ছাড়ার সময় | পৌঁছানোর স্টেশন | পৌঁছানোর সময় | সাপ্তাহিক ছুটি |
| সোনার বাংলা এক্সপ্রেস | ৭৮৮ | ঢাকা (কমলাপুর) | সকাল ০৭:০০ মি. | চট্টগ্রাম | দুপুর ১১:৫৫ মি. | বুধবার |
চট্টগ্রাম টু ঢাকা সময়সূচী:
| ট্রেনের নাম | ট্রেন নং | ছাড়ার স্টেশন | ছাড়ার সময় | পৌঁছানোর স্টেশন | পৌঁছানোর সময় | সাপ্তাহিক ছুটি |
| সোনার বাংলা এক্সপ্রেস | ৭৮৭ | চট্টগ্রাম | বিকাল ১৬:৪৫ মি. | ঢাকা (কমলাপুর) | রাত ২১:৪০ মি. | মঙ্গলবার |
দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশ রেলওয়ে যেকোনো সময় সময়সূচী পরিবর্তন করার অধিকার রাখে। তবে সাধারণত এই সময়সূচী অনুযায়ী ট্রেন চলাচল করে থাকে। যাত্রার আগে অনলাইন থেকে বর্তমান অবস্থা চেক করে নেওয়া ভালো।
সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের বিরতি স্টেশন
অনেকেই মনে করেন বিরতিহীন ট্রেন মানে এটি কোথাও থামবে না। কিন্তু যাত্রীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস একটি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দেয়। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর বা চট্টগ্রাম থেকে আসার পথে শুধুমাত্র ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে থামে। এর বাইরে ভৈরব বা ফেনী কোনো স্টেশনে এটি থামে না।
নিচে বিরতি স্টেশনের সময়সূচী দেওয়া হলো:
| রুট | স্টেশনের নাম | পৌঁছানোর সময় | ছাড়ার সময় |
| ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম (৭৮৮) | বিমানবন্দর স্টেশন | সকাল ০৭:২২ | সকাল ০৭:২৫ (আনুমানিক) |
| চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা (৭৮৭) | বিমানবন্দর স্টেশন | রাত ২১:২০ (আনুমানিক) | রাত ২১:২৫ |
এই স্টেশনে বিরতি দেওয়ায় উত্তরা, টঙ্গী বা গুলশান এলাকার যাত্রীরা সহজেই কমলাপুর না গিয়ে বিমানবন্দর স্টেশন থেকে এই ট্রেনে উঠতে পারেন।
সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাড়ার তালিকা ২০২৬
বিলাসবহুল সেবা প্রদানের কারণে সাধারণ ট্রেনের তুলনায় সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের ভাড়ার তালিকা কিছুটা ভিন্ন। এখানে মূলত এসি ও নন-এসি দুই ধরনের সিট ব্যবস্থা থাকলেও, এই ট্রেনের শোভন চেয়ারগুলোও বেশ আরামদায়ক। টিকেটের মূল্য বাংলাদেশ সরকার ও রেলওয়ে মন্ত্রণালয় দ্বারা নির্ধারিত হয়। ভাড়ার সাথে সাধারণত ১৫% ভ্যাট যুক্ত থাকে।
| আসন বিভাগ (Class) | ভাড়ার পরিমাণ (টাকা) | মন্তব্য |
| শোভন চেয়ার (Shovan Chair) | ৪৫০ টাকা | নন-এসি, কিন্তু আরামদায়ক |
| স্নিগ্ধা (Snigdha – AC) | ৮৫৫ টাকা | এসি সিট |
| এসি সিট (AC Seat) | ১০২৫ টাকা | এসি কেবিন সিট |
| এসি বার্থ (AC Berth) | ১,২০০+ টাকা (পরিবর্তনশীল) | শোয়ার ব্যবস্থা থাকে |
(বি.দ্র: টিকিটের মূল্যের সাথে অনলাইন চার্জ বা সার্ভিস চার্জ যুক্ত হতে পারে যদি আপনি অনলাইনে টিকিট কাটেন। ভাড়ার তালিকা রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিবর্তন হতে পারে।)
কেন সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে ভ্রমণ করবেন?
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে তো অনেক ট্রেন আছে, তাহলে কেন আপনি সোনার বাংলা এক্সপ্রেস বেছে নেবেন? এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:
- এটি মাত্র ৫ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছে দেয়, যা বাসের চেয়ে অনেক কম সময়।
- বারবার স্টেশনে থামার ঝামেলা নেই, ফলে যাত্রীরা বিরক্ত হন না।
- এই ট্রেনে পুলিশ এবং আনসার বাহিনী সর্বদা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে।
অনলাইনে টিকেট কাটার নিয়ম
বর্তমানে ঘরে বসেই আপনি সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের টিকিট কাটতে পারেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (eticket.railway.gov.bd) বা ‘Rail Sheba’ অ্যাপ ব্যবহার করে খুব সহজেই টিকিট বুক করা যায়।
- প্রথমে ওয়েবসাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
- এরপর ‘From’ এবং ‘To’ অপশনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিলেক্ট করতে হবে।
- যাত্রার তারিখ এবং ট্রেনের নাম ‘Sonar Bangla Express’ নির্বাচন করুন।
- পছন্দের সিট বা ‘Seat Selection’ অপশন থেকে সিট বেছে নিন।
- পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে (বিকাশ, নগদ, রকেট বা কার্ড) টাকা পরিশোধ করলেই টিকিট কনফার্ম হয়ে যাবে।
সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের মধ্যে পার্থক্য
অনেকেই সুবর্ণ এবং সোনার বাংলার মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। দুটিই বিরতিহীন এবং বিলাসবহুল ট্রেন। তবে মূল পার্থক্য হলো তাদের সময়সূচী ও ছুটির দিনে। সুবর্ণ এক্সপ্রেস সকালে চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ে ও বিকেলে ঢাকা থেকে। অন্যদিকে সোনার বাংলা সকালে ঢাকা থেকে ও বিকেলে চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ে। তাই আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন (FAQs)
সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটির দিন কবে?
সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে বুধবার বন্ধ থাকে এবং চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে মঙ্গলবার বন্ধ থাকে।
সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে কি খাবার দেওয়া হয়?
আগে টিকিটের মূল্যের সাথে খাবারের দাম ধরা থাকত। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে খাবার আলাদা কিনতে হয়। ট্রেনের ভেতরেই ক্যান্টিন বা ফুড কার আছে যেখানে বার্গার, কাটলেট, চিকেন ফ্রাই ইত্যাদি পাওয়া যায়।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সোনার বাংলা ট্রেনের কত সময় লাগে?
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে এই ট্রেনের সময় লাগে প্রায় ৫ ঘণ্টা ৪০ মিনিট।
সোনার বাংলা এক্সপ্রেস কি বিমানবন্দর স্টেশনে থামে?
হ্যাঁ, ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে এই ট্রেনটি যাত্রী ওঠানামার জন্য থামে।
সোনার বাংলা ট্রেনের এসি টিকিটের দাম কত?
স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) টিকিটের দাম ৮৫৫ টাকা এবং এসি সিট ১০২৫ টাকা (ভ্যাটসহ)।
আশা করি, এই তথ্যগুলো আপনার পরবর্তী ভ্রমণে সহায়ক হবে। ট্রেনের সময়সূচী বা ভাড়ার পরিবর্তন সংক্রান্ত আপডেট জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন। আপনার যাত্রা শুভ ও নিরাপদ হোক। ধন্যবাদ আমাদের সাথে থাকার জন্য।






